ইসলামের দৃষ্টিতে তাবিজ-কবচ

অনেকেই অসুস্থতাবোধ করলে সঠিক চিকিৎসার না করে তাবিজ-কবচ, গাছ-গাছালির শিকর-বাকর ইত্যাদি ব্যবহার করেন। তাদের বিশ্বাস এসব ব্যবহার রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করা যায়। কিন্তু এগুলো ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েজ কিনা এ বিষয় বিবেচনা করে না। এছাড়া এ ধরণের চিকিৎসার মূল্যায়ন ও তার বৈধতা-অবৈধতা সম্পর্কে তারা পুরোপুরি অজ্ঞ। এছাড়া এক শ্রেণির মানুষ রয়েছে, যারা নিজেরে মনগড়া তথ্য দিয়ে এগুলো জায়েজ বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। কিন্তু কোনও দলিল দিতে পারেন না।

হযরত ইমরান বিন হুসাইন (রা.) বর্ণিত, একদা নবী করিম (সা.) এক ব্যক্তির হাতে তামার চুড়ি দেখে বললেন, এটা কি? তিনি বললেন, এটা অহেনার অংশ। (অহেনার অর্থ এক প্রকার হাড়, যা থেকে কেটে ছোট ছোট তাবিজ আকারে দেয়া হয়) নবী করিম (সা.) বললেন, এটা খুলে ফেল, কারণ এটা তোমার দূর্বলতা বাড়ানো ভিন্ন কিছুই করবে না। যদি এটা বাঁধা অবস্থায় তোমার মৃত্যু হয়, তবে কখনো তুমি সফল হবে না।’ (মুসনাদে আহমদ, হাকেম ও ইবনে মাজাহ)

হযরত উকবা বিন আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসুলকে (সা.) বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি তাবিজ লটকালো, আল্লাহ তাকে পূর্ণতা দেবেন না, আর যে কড়ি ব্যবহার করবে, আল্লাহ তাকে মঙ্গল দান করবেন না।’ (মুসনাদে আহমদ, হাকেম)হযরত উকবা বিন আমের আল-জোহানি (রা.) বলেন, ‘একদা রাসুল (সা.) এর খেদমতে একদল লোক উপস্থিত হল। মহানবী (সা.) দলটির নয়জনকে বায়আত করলেন একজনকে করলেন না। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসুল! নয়জনকে বায়আত করলেন একজনকে করলেন না? রাসুল (সা.)বললেন, তার সঙ্গে তাবিজ রয়েছে। অতঃপর তিনি স্বহস্তে তা ছিড়ে ফেললেন এবং তাকে বায়আত করলেন, আর বললেন, যে ব্যক্তি তাবিজ ব্যবহার করল সে শিরক করল।’ (মুসনাদে আহমদ, হাকেম)

একদা হযরত হুজায়ফা (রা.) এক ব্যক্তির হাতে জ্বরের একটি তাগা দেখতে পেয়ে তা কেটে ফেলেন। অতঃপর তিনি সুরা ইউসুফের ১০৬নং আয়াতটি তিলাওয়াত করেন, ‘তাদের অধিকাংশ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তবে শিরক করা অবস্থায়।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির)হযরত আবু বশির আনসারি (রা.) কোনও এক সফরে রাসুল (সা.) এর সঙ্গী ছিলেন। সে সফরে রাসুল (সা.) জনৈক ব্যক্তিকে এ নিদের্শ দিয়ে পাঠালেন, ‘কোনো উটের গলায় ধনুকের ছিলা অথবা বেল্ট রাখবে না, সব কেটে ফেলবে।’ (বুখারি, মুসলিম)হযরত আবু ওয়াহহাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ঘোড়া বেঁধে রাখ, তার মাথায় ও ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দাও এবং লাগাম পরিয়ে দাও। তবে ধনুকের ছিলা ঝুলিয়ো না।’ (সুনানে নাসায়ী)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এর স্ত্রী হযরত জয়নব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একদিন আব্দুল্লাহ বাড়িতে এসে আমার গলায় তাগা দেখতে পান। তিনি বললেন, এটা কী? আমি বললাম, এটা পড়া তাগা। এতে আমার জন্য ঝাঁড়-ফুঁক দেয়া হয়েছে। তা নিয়ে তিনি কেটে ফেললেন এবং বললেন, আব্দুল্লাহর পরিবার শিরক থেকে মুক্ত।’ তিনি বলেন, আমি রাসুলকে (সা.) বলতে শুনেছি, ‘ঝাড়-ফুঁক, সাধারণ তাবিজ ও ভালোবাসা সৃষ্টির তাবিজ ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে শিরক।’ (আহমদ, হাকেম, ইবনে মাজাহ)

এসব দলিলের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, তাবিজ ব্যবহার করা হারাম ও শিরক। তাবিজ ইত্যাদি ব্যবহার করা ছোট শিরক না বড় শিরক?কেউ যদি তাবিজ-কবচ, মাদুলি-কড়ি, সামুক-ঝিনুক, গিড়া, হাঁড়, তাগা-তামা-লোহা বা অনুরূপ কোনো ধাতব বস্তু গলায় বা শরীরের কোথায়ও ধারণ করে এবং এ ধারণা পোষণ করে যে, ওগুলো বালা-মুসিবত দূর করার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ক্ষমতা রাখে, তবে তা বড় শিরক। আর যদি এ ধরণের ধারণা না হয়, তবে তা ছোট শিরক।শায়খ সুলাইমান বিন আব্দুল্লাহ বলেছেন, ‘বালা-মুসিবত দূর করার উদ্দেশ্যে গিড়া, তাগা পরিধান করা ছোট শিরক।’ অর্থাৎ যদি তা মাধ্যম বা উসিলা মনে করে ব্যবহার করা হয়।

শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বাজ বলেছেন, ‘শয়তানের নাম, হাড়, পূঁতি, পেরেক অথবা তিলিস্মা অর্থাৎ অর্থবিহীন বিদঘুটে শব্দ বা অক্ষর প্রভৃতি বস্তু দিয়ে তাবিজ বানানো ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত।’ ফাতহুল মাজিদ গ্রন্থের টীকায় তিনি আরও বলেছেন, ‘তাবিজ ব্যবহার করা জাহেলি যুগের আমল।’শায়খ হাফেজ হেকমি বলেন, ‘কুরআন ও হাদিস ব্যতীত, ইহুদিদের তিলিসমাতি, মূর্তি পূজারি, নক্ষত্র পূজারি, ফেরেশতা পূজারি এবং জিনের খিদমত গ্রহণকারী বাতিল পন্থীদের তাবিজ ব্যবহার, অনুরূপভাবে পূঁতি, ধনুকের ছিলা, তাগা এবং লোহার ধাতব চুড়ি ইত্যাদি ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে শিরক। কারণ, এগুলো সমস্যা সমাধানের বৈধ উপায় কিংবা বিজ্ঞান সম্মত ঔষধ নয়।’এ হল সেসব তাবিজ কবচের হুকুম যাতে কুরাআনের আয়াত, হাদিসের দোয়া দরুদ ইত্যাদি ব্যবহার করা হয় না তার।

কুরআন-হাদিসের তাবিজ : হ্যাঁ, যে সব তাবিজ-কবচে কুরআন হাদিস ব্যবহার করা হয় সে ব্যাপারে আলেমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। এক শ্রেণির আলেম কুরআন-হাদিসে বর্ণিত দুআ সমূহের তাবিজ ব্যবহার করা বৈধ মনে করেন। যেমন: সাঈদ বিন মুসাইয়িব, আতা আবু জাফর আল-বাকের, ইমাম মালেক। এক বর্ণনা মতে ইমাম আহমদ, ইবনে আব্দুল বার, বাইহাকি, কুরতুবি, ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাইয়িম এবং ইবনে হাজারও রয়েছেন। তাদের দলিল, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করেছি যা রোগের সু-চিকিৎসা এবং মুমিনদের জন্য রহমত।’ (সুরা ইসরা, আয়াত :৮২)

অন্য আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘এক কল্যাণময় কিতাব, ইহা আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি।’ (সুরা সাদ, আয়াত :২৯)হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা.) এর ব্যক্তিগত আমল সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি নিজ ছোট বাচ্চা, যারা দোয়া মুখস্থ করতে অক্ষম, তাদেরকে অনিষ্ট থেকে রক্ষার জন্য গায়ে দোয়ার তাবিজ ঝুলিয়ে দিতেন। দোয়াটি এই, ‘আল্লাহর নামে তাঁর পরিপূর্ণ বাণী সমূহের মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তার গজব ও শাস্তি থেকে, তার বান্দাদের অনিষ্টতা থেকে এবং শয়তানদের কুমন্ত্রণা ও তাদের উপস্থিতি থেকে।’ (আহমদ, তিরমিজি, আবু দাউদ)

পক্ষান্তরে অধিকাংশ সাহাবি ও তাদের অনুসারীদের মতে কুরআন ও হাদিসের তাবিজ ব্যবহার করাও নাজায়েজ। তাদের মধ্যে রয়েছেন, হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ, ইবনে আব্বাস, হুযাইফা, উকবা বিন আমের, ইবনে উকাইম, ইব্রাহিম নখয়ি (রা.), একটি বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম আহমদ, ইবনুল আরাবি, শায়খ আব্দুর রহমান বিন হাসান, শায়খ সুলাইমান বিন আব্দুল ওয়াহহাব, শায়খ আব্দুর রহমান বিন সাদি, হাফেজ আল-হেকমি এবং মুহাম্মদ হামিদ আলফাকি।তারা বলেন, উল্লেখিত আয়াত দ্বারা তাবিজের বৈধতা প্রমাণিত হয় না। উপরন্তু রাসুল (সা.) কুরআনের দ্বারা চিকিৎসা করার স্বরূপ স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, আর তা হচ্ছে কুরআন তিলাওয়াত করা এবং সে অনুযায়ী আমল করা। এছাড়া কুরআনের আয়াত তাবিজ আকারে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে রাসুল (সা.) থেকে কোনো প্রমাণ নেই, এমনকি সাহাবাদের থেকেও।

একটি সংশয় : অনেকে বলে থাকেন, তাবিজ, কবচ ইত্যাদি আমরা দোয়া-দরুদ ও প্রাকৃতিক ঔষধের ন্যায় ব্যবহার করি। যদি তার অনুমোদন থাকে তবে তাবিজ কবচ নিষিদ্ধ কেন? এর উত্তর হচ্ছে : অসুখ-বিসুখ ও বালা-মুসিবত থেকে মুক্তি পাওয়ার পদ্ধতি দুইটি : (১) যা সরাসরি কুরআনের আয়াত বা রাসূলের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। একে শরিয়তি উপায় বা চিকিৎসা বলা যেতে পারে। যেমন: ঝাঁড় ফুক ইত্যাদি, যা রাসুল (সা.) করে দেখিয়েছেন এবং যার বর্ণনা হাদিসের বিভিন্ন কিতাবে রয়েছে। এ গুলো আল্লাহর ইচ্ছায় বান্দার মঙ্গল সাধন বা অমঙ্গল দূর করে। (২) প্রাকৃতিক চিকিৎসা অর্থাৎ বস্তু ও তার প্রভাবের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক, যা খুবই স্পষ্ট এমনকি মানুষ সেটা বাস্তবে অনুভব ও উপলব্ধি করতে পারে। যেমন: বিভিন্ন কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি করা ঔষধ। ইসলামি শরিয়ত এগুলো ব্যবহার করার জন্য উৎসাহ প্রদান করেছে। কারণ, এগুলো ব্যবহার করার অর্থই হচ্ছে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা।

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *