কোরআনের হাফেজ হয়ে মেয়েরাও দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনছেন

ইসলামি জীবন দর্শনে নারীকে কখনও বৈষম্যমূলক দৃষ্টিতে দেখা হয়নি। বরং সর্বত্র নারী ও পুরুষের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা হয়েছে।পবিত্র কোরআনে বারবার মানুষকে পড়াশোনা করতে, জ্ঞানার্জনে ব্রতী হয়ে আল্লাহর সৃষ্টিকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে বলা হয়েছে। কিন্তু কোথাও জ্ঞান শিক্ষার যোগ্যতা এককভাবে পুরুষদের দেওয়া হয়নি।আর সে জন্য বিশ্বনবী (সা.) দ্বিধাহীনকন্ঠে ঘোষণা করেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য জ্ঞানার্জন করা ফরজ (অবশ্য কর্তব্য)। ’

অতএব এটা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, ইসলামি দর্শন নারী শিক্ষার উৎসাহ দাতা ও পথ প্রদর্শক। ইসলামে নারী শিক্ষার সুযোগ সীমিত- এমন বহুল প্রচারিত ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। মানবজাতির অর্ধাংশ নারী জাতিকে অজ্ঞানতার অন্ধকারে রেখে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না।  আমাদের দেশে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে নারীর উপস্থিতি সন্তোষজনক নয় বললেই চলে। সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় শৈশব তথা বাল্যাবস্থায় মসজিদ-মক্তবে সামান্য প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। তাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত ও অসংগঠিত। আর হাল সময়ে নারীদের জন্য বিশেষায়িত কিছু মহিলা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হলেও সেগুলো মানোত্তীর্ণ বলা যায় না।

তার পরও মেয়েরা ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছেন। এরই ধারাবাজিকতায় কোরআনে কারিম হেফজের ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর প্রচুর মেয়ে কোরআনে কারিমের হাফেজ হচ্ছেন। এমনকি নারী হাফেজরা বিদেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করছেন। বয়ে আনছেন আপন প্রতিভাগুণে দেশের জন্য সম্মান। এমনই এক মেয়ে হাফেজ রাফিয়া হাসান জিনাত।হাফেজ রাফিয়া হাসান জিনাত। জন্ম পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার চাঁদকাঠি গ্রামে। বাবা মাওলানা নাজমুল হাসান ও মা জাকিয়াতুন নেসা দু’জনই পেশায় শিক্ষক।

হাফেজ রাফিয়া হাসান জিনাত ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সফলতার সাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন।  যাত্রাবাড়ি দনিয়ার জাহিরুন নেসা মাদরাসায় রাফিয়া শিক্ষার হাতেখড়ি। এর পর ওয়ারির সাউদা বিনতে জামআ ইন্টারন্যাশনাল বালিকা মাদরাসার ২০০৮ সালে কোরআনে কারিম হিফজ করা শুরু করেন। মাত্র দেড় বছরে কোরআনে কারিম হিফজ শেষে অধিকতর শুনানির জন্য রাফিয়া কারি নেছার আহমাদ আন নাছিরী কর্তৃক পরিচালিত মাদরাসা মারকাজুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনালে ভর্তি হন।২ বোনের সংসারে রাফিয়া হাসান জিনাত বড়। তার ছোট বোনও কোরআনে কারিমের হাফেজ। এ বছর দাখিল ১০ম শ্রেণিতে পড়ছেন রাফিয়া।

রাফিয়া বেসরকারি টেলিভিশন আরটিভির হিফজুল কোরআন রিয়েলিটি শো’ আলোকিত কোরআনে অংশ নিয়ে ২০১২ সালে ১ম ও এনটিভির ইসলামিক রিয়েলিটি শো’ পিএইচপি কোরআনের আলো হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় ২০১৬ সালে ৬ষ্ঠ স্থান লাভ করেন।  এভাবে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে রাফিয়া ২০১৪ সালে জর্ডানের রাজধানী আম্মানে শুধুমাত্র নারী হাফেজদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে ৩য় স্থান লাভ করেন। প্রতিযোগিতায় ৪৩টি দেশ অংশ নিয়েছিল।

এর পর ২০১৬ সালে শুধুমাত্র নারীদের অংশগ্রহণে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ১৯তম ফাতেমা বিনতে মোবারক আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ৯ম স্থান লাভ করেন। ওই প্রতিযোগিতায় ৮৩টি দেশ অংশ নিয়েছিল।  অবসর সময়ে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত আর বই পড়তে ভালোবাসেন রাফিয়া।  জর্ডান কোরআন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি কোরআনে বর্ণিত আসহাবে কাহাফের গুহা, ডেড সী বা মৃত সাগর ও নবী হজরত ইউশা বিন নুনের মাজারসহ আরও ঐতিহাসিক বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেছেন।  আমরা রাফিয়ার উজ্জ্বল ভবিষ্যত কামনা করি।

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *