ব্যাপারিদের মাথায় হাত, দাম শুনেই দৌড় দিচ্ছেন ক্রেতা

আর মাত্র একদিন পরেই পবিত্র ঈদুল আজহা। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে গরুর ব্যাপারিরা ট্র‍াক ভর্তি গরু নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন হাটে পৌঁছেছেন। গত তিন থেকে চারদিন গরু নিয়ে হাটে এসে পৌঁছালেও বেশিরভাগ ব্যাপারিদের একটা গরুও এখন পর্যন্ত বিক্রিই হয়নি। শুধু দরদামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। একদিকে যেমন দেশব্যাপী মহামারি করোনা ভাইরাসের ভয় অন্যদিকে পশু বিক্রি না হওয়াতে ব্যাপারি ও পশু মালিকদের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। ব্যাপারিরা বলছেন, এমন অবস্থা আগে কখনো হয়নি। শুধুমাত্র দরদাম জিজ্ঞেস করেই দৌড় দিচ্ছেন ক্রেতারা। ক্রেতাদের মনোভাব দেখে মনে হচ্ছে, যেন জোর করে পশু বিক্রি করতে চাইছে ব্যাপারিরা।কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গত শনিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোরবানির পশুর হাট বসেছে রাজধানীতে। মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে এবার ঢাকার দুই সিটিতেই কমেছে হাটের সংখ্যা। মোট হাট বসেছে ১৭টি। একটি বাদে ১৬টিই অস্থায়ী হাট।গরু দেখতে গাবতলীর হাটে এসেছেন রফিকুল ইসলাম। তিনি ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘আজ হাটে এসেছি শুধু গরুর দরদাম দেখতে। যদি একেবারেই দরদামে কোনোটা পছন্দ হয়ে যায়, তবে কিনে ফেলব। তা না হলে হয়তো আরও দু-একদিন বা দু-একটি হাট দেখব। এখনো তো সময় আছে। তাই তাড়াহুড়ো নেই।একই কথা বললেন হাটে আসা কল্যাণপুরের বাসিন্দা নাফিস রায়হান খান। তিনি ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘অনলাইনে গরু কিনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে পছন্দ করতে পারছিলাম না। একদিকে দাম বেশি দেখাচ্ছে, অন্যদিকে গরু নিজ চোখে দেখা যাচ্ছে না। তাই হাটে এলাম। তবে হাটে এসেও মনে হচ্ছে এবার গরুর অনেক দাম। তাই আরও দুয়েক হাট ঘুরে তারপর কিনব।তবে দাম নিয়ে ক্রেতাদের এমন আপত্তির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন কুষ্টিয়া থেকে আসা ব্যাপাপি জমির শেখ। তিনি ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘আমি ১২টা গরু আনছি পরশুদিন। এর মধ্যে মাত্র দুটি বিক্রি করতে পেরেছি। তাও আবার কম লাভে।
তিনি বলেন, ‘দুয়েকজন দাম জিজ্ঞাসা করছে। কাস্টমার তেমন নেই। সামান্য লাভ পেলেই বিক্রি করে দেবো। কারণ এবার গরুর দাম অনেক কম। তাই খরচ উঠে সামান্য কিছু লাভ হলেই বিক্রি করে দেবো।রাজধানীর ১৭টি হাটের মধ্যে একমাত্র গাবতলী হাটটিই স্থায়ী। গতকাল বুধবার (২৯ জুলাই) এই হাট ঘুরে দেখা যায়, দর্শনার্থীদের আনাগোনা প্রচুর। তবে গত বছরের চেয়ে বেচাকেনা হচ্ছে কম। বিক্রেতারা জানান, এবার করোনার মধ্যে অনেকেই হাটে আসছেন না, তবে আশা করা যাচ্ছে হয়তো একদিন আগে অর্থাৎ শুক্রবার নাগাদ জমে উঠবে বেচাকেনা।অন্যদিকে ক্রেতারা বলছেন, ঈদের এখনো দুই দিন বাকি আছে। তাই একটু সময় নিয়ে দেখেশুনে কোরবানির পশু কিনতে চান তারা। আপাতত তাই দাম যাচাই করছেন। তাছাড়া হাটে এখনও পর্যাপ্ত গরু না আসায় একেবারেই পছন্দ না হলে আরও দু-একদিন পরেই পছন্দের পশুটি কিনতে চান ক্রেতারা।

একই কথা বললেন পাবনার চাটমোহর থেকে আসা ব্যাপারী সুমন মিয়া। তিনি ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘সোমবার ৭টা গরু নিয়ে হাটে আসলাম। কিন্তু এখনও বিক্রি করতে পারিনি একটাও। কাস্টমাররা আসছে। দাম জিজ্ঞেস করেই চলে যাচ্ছে। এভাবেই চলছে। কাস্টমাররা মনে করছে দাম বেশি। কিন্তু আমরা তো খামারে লালন-পালনের খরচসহ যাবতীয় খরচ হিসেব করেই সামান্য লাভ রেখেই বিক্রি করছি। তবুও কাস্টমারের দেখা নাই। শুয়েবসেই দিন কাটছে এখনও।চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা ব্যাপারী বাবুল মিয়া ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘ছোট-বড় মিলিয়ে চৌদ্দটি গরু হাটে এনেছি। কিন্তু গত দুই দিন ধরে মানুষ দাম শুনেই দৌড় দিচ্ছে। তেমন কেউ দরদামও করছে না। করোনার এমন পরিস্থিতিতে আমরা কীভাবে কী করবো বুঝতে পারছি না।তিনি বলেন, ‘করোনার ভয়ে চেয়েছিলাম খুব দ্রুত গরুগুলো কিছুটা লাভেই বিক্রি করে দেবো। কিন্তু লাভ তো দূরের কথা, আসল দামও কেউ বলছে না।চাপাইনবাবগঞ্জ থেকে দুটি ছোট গরু নিয়ে এসছেন করিম নামের এক খামারি। বাড়িতে লালন পালন করা গরু দুটি বছর খানেক আগে লাখ টাকা দিয়ে কিনেছিলেন।করিম ব্রেকিংনিউজকে জানান, সোমবার রাতে গাবতলী হাটে গরু নিয়ে এসেছেন। মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত গরু দুটির দাম লাখ টাকায় উঠেনি। দাম আর বেশি না উঠলে তাকে লোকসান গুণতে হবে।একইভাবে চাপাইনবাবগঞ্জের আরেক খামারি অব্দুল হামিদ ব্রেকিংনিউজকে জানান, তার গরুটি দুমাস আগে ৪০ হাজার টাকায় কেনা ছিল। মঙ্গলবার এই বাজারে গরুটির দাম ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার টাকা বলা হচ্ছে। এই দামে গরু বিক্রি করতে হলে তাকে অন্তত ১৫ হাজার টাকা লোকসান গুণতে হবে।এছাড়া হাটে আসা অনেকের মুখে নেই মাস্ক। মানছেন না সামাজিক দূরত্বও। অনেকে গাদাগাদি করে গরুর পাশে ভিড় করছেন। যারা গরু নিয়ে এসেছেন তাদেরও অনেকের মুখে নেই মাস্ক। অথচ সবার জন্য মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে সরকার।গাবতলী হাটের ইনচার্জ সজীব সরকার ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘গতকাল (মঙ্গলবার) একজন তার স্ত্রী সন্তানসহ আটজনকে নিয়ে হাটে এসেছেন। আজও অনেকেই তিন, চারজন, পাঁচজন পর্যন্ত একসঙ্গে হাটে এসেছেন। এটা তো স্বাস্থ্যবিধির মধ্যে পড়ে না। যারা হাটে আসছেন তাদের এ বিষয়টি মানা উচিত।স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় গাবতলী হাট ইজারাদারের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে জানিয়ে সজীব বলেন, ‘এবার আমাদের হাসিল ঘর বাড়ানো হয়েছে। গত বছর সাতটা হাসিল ঘর ছিল। এবার ১২টা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ক্রেতারা দূরত্ব বজায় রেখে হাসিল পরিশোধ করতে পারবেন। এছাড়া হাটে নিয়মিত জীবাণুনাশক ছিটানোর কাজে আমাদের কর্মীরা কাজ করছে। হাসিল ঘরে যারা থাকবে বা অন্যান্য কাজে যারা নিয়োজিত আছে সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।শেষ তিন দিন কোরবানির পশুর বিক্রি বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানালেন হাটের এই কর্মী। মূল হাটে সিটি করপোরেশনের বেঁধে দেয়া নিয়ম অনুযায়ী সাত ফুট দূরে দূরে গরু রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে মূল হাটের বাইরে যে গরু রাখা হবে, তারা কতটা সামাজিক দূরত্ব মানবেন তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বলেও জানান সজীব সরকার। যদিও মূল হাটের বাইরে যারা গরু রাখবেন তাদের জন্যও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ভাবছেন তারা।এদিকে, স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হাটে খাস আদায়ের জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বসানো হয়েছে কাউন্টার। সেই সঙ্গে মাইকিংয়ের মাধ্যমে মাস্ক পরা এবং শিশু ও বয়স্কদের হাটে না নিয়ে আসার বিষয়ে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।সরেজমিনে দেখা যায়, হাটে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে অনেকে সপরিবারে এসেছেন কোরবানির পশু পছন্দ করতে। কেউ কেউ শিশুদেরও নিয়ে এসেছেন হাটে। অথচ এটা স্বাস্থ্যবিধির লঙ্ঘন বলে স্পষ্ট উল্লেখ আছে।হাটে আসা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে তারা ব্রেকিংনিউজের এই প্রতিবেককে জানান, প্রতি বছর কোরবানি ঈদে তারা হাটে এসে দেখেশুনে পশু কিনেন। এবারও সেটাই করছেন। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে তারা খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে মনে হলো না।এদিকে গাবতলী ছাড়া অন্যান্য হাটেও খবর নিয়ে জানা গেছে, সেখানেও ক্রেতা সাধারণের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বালাই কম। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে জনসাধারণকে সচেতন করতে।গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাজধানীর ভাটারা সাইদ নগরে স্থাপিত অস্থায়ী কোরবানি পশুর হাট পরিদর্শন করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম।পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন ডিএনসিসিতে প্রতিবছর ১০-১১টি হাট বসে থাকে। এবার কোভিড মোকাবিলার জন্য আমরা চেষ্টা করেছি ঢাকা শহরের বাইরে কিছু জায়গায় হাট বসানোর জন্য। বর্তমানে একটি স্থায়ী হাট গাবতলীতে এবং পাঁচটি অস্থায়ী হাট শহরের বাইরের দিকে খোলামেলা জায়গায় বসানো হয়েছে। এছাড়া, হাটে না গিয়ে অনলাইন থেকে কোরবানির পশু কেনা, কোরবানি দেওয়া, মাংস প্রস্তুত করা এমনকি বাসায় মাংস পৌঁছে দেওয়ার জন্য ডিজিটাল হাটও বসানো হয়েছে।মেয়র বলেন, ‘মহামারির মধ্যেই এবার ঈদ হচ্ছে। বেঁচে থাকলে আরও অনেক কোরবানির ঈদ করতে পারবো। কিন্তু এবারে যারা হাটে আসবেন মেহেরবানি করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। আপনার সুরক্ষা আপনার হাতে। আমরা কেবল সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাবো। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে যে বিধিগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলো মেনে চলতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।কোরবানির স্থান প্রসঙ্গে আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘বছিলায় ২ হাজার কোরবানির পশু কোরবানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ডিএনসিসি থেকে ২৫৬টি স্থানে কোরবানি দেওয়ার জন্য জায়গা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আমি সবাইকে অনুরোধ করবো, এই সব স্থানে কোরবানির দিন। মহামারি ও কোরবানি মাথায় রেখে নিজ নিজ দায়িত্বে শহর পরিষ্কার রাখুন।এবার ঢাকা উত্তর সিটিতে গাবতলী হাট ছাড়াও পাঁচটি অস্থায়ী হাট বসেছে। উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরে বৃন্দাবন হতে উত্তর দিকে বিজিএমইএ ভবন পর্যন্ত খালি জায়গা, কাওলা শিয়াল ডাঙ্গা সংলগ্ন খালি জায়গা, ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্বাচল ব্রিজ সংলগ্ন, মস্তুল ডুমনী বাজারমুখী রাস্তার উভয় পাশের খালি জায়গা, ভাটারা (সাইদ নগর) পশুর হাট এবং উত্তরখান মৈনারটেক হাউজিং প্রকল্পের খালি জায়গা।এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) এলাকায় হাট বসছে ১১টি। হাটগুলো হলো- কমলাপুর লিটল ফ্রেন্ডস ক্লাব সংলগ্ন গোপীবাগ বালুর মাঠও কমলাপুর স্টেডিয়াম সংলগ্ন বিশ্বরোডের আশপাশের খালি জায়গা, আফতাবনগর ব্লক-ই, এফ, জি এর সেকশন ১ ও ২ নম্বর এলাকা, হাজারীবাগ লেদার টেকনোলজি কলেজ সংলগ্ন খালি জায়গা, উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজারের মৈত্রী সংঘের মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট সংলগ্ন খালি জায়গা, মেরাদিয়া বাজার সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, দনিয়া কলেজ মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গা, ধূপখোলা মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গা, সাদেক হোসেন খোকা মাঠের পাশে ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনাল সংলগ্ন উন্মুক্ত জায়গা, আমুলিয়া মডেল টাউনের খালি জায়গা এবং রহমতগঞ্জ খেলার মাঠ সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা।

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *