সেই রাতে যেভাবে জন্মেছিলেন যিশু

যখন যিশু মরিয়মের গর্ভে তখন কাঠমিস্ত্রী যোসেফের সাথে মরিয়মের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু যোসেফ খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। মরিয়ম নামে যে কুমারী মেয়েটিকে তিনি ভালোবাসের এরইমধ্যে তিনি গর্ভবতী হয়ে পড়েছেন এবং এটি তার নিজের সন্তান নয়; যদিও যিশুর জন্ম ঈশ্বরের কথায় হবে, তবুও তখন তো তাদের বিয়ের হয়নি। মানুষেরা নানারকম আজেবাজে কথা বলছে। তাকে অবশ্যই তাদের বিয়ে ভেঙে দিতে হবে। কিন্তু সেই রাতে তিনি একটি স্বপ্ন দেখলেন।ঈশ্বরের দূত তাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললেন: ‘মরিয়মের সঙ্গে তুমি তোমার সম্পর্ক ভেঙে দিও না। কারণ সে কোনও পাপ করেনি। ঈশ্বর তাকে বেছে নিয়েছেন তার পুত্রের মা হবার জন্য- ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞা করা রাজার মা হবার জন্য। তুমি সেই ছেলের নাম রাখবে যিশু (ত্রাণকর্তা), কারণ তিনি তাঁর লোকদের পাপ থেকে পরিত্রাণ করবেন।’

যোসেফের যখন ঘুম ভাঙলো তখন তিনি বড় একটি দুশ্চিন্তার সমাধান খুঁজে পেলেন। লোকে কি বলবে সেটা বড় কথা নয়, যোসেফ মরিয়মকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং যিশুকে নিজের সন্তান হিসেবে পালন করার জন্যও সিদ্ধান্ত নিলেন।এ ঘটনার কয়েক মাস পরে রোমীয় সম্রাট আগস্ত কৈসর একটি আদেশ জারি করলেন। রোমীয় সাম্রাজ্যে যারা বাস করে তাদের সকলকেই নিজেদের শহরে বা গ্রামে গিয়ে নাম লেখাতে হবে। সম্রাট নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যে, তার রাজ্যের নামের তালিকায় সবারই নাম থাকবে আর সবাই তাকে কর দেবে।কাঠমিস্ত্রী যোসেফের পরিবার ছিল রাজা দায়ূদের বংশধর। তাই তাকে বেথেলহেমে যেতে হবে, কারণ সেখানেই রাজা দায়ূদ জন্মেছিলেন। এখন মরিয়মকে সঙ্গে নিয়ে নাসরত থেকে দক্ষিণে পাহাড়ি পথ বেয়ে প্রায় ৮০ মাইল দূরে বেথেলহেম যেতে হচ্ছে। তাই তাদের খাবারদাবার এবং শীতের জন্য গরম কাপড়-চোপড় গাধায় চাপিয়ে নিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া শিশুটির জন্য প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র নিতে হবে। কারণ শিশুটির জন্মের সময়ও ঘনিয়ে এসেছে, যেকোনও সময় সে জন্ম নিতে পারে।

মরিয়ম যখন বেথেলহেমে এসে পৌঁছালেন তখন তিনি খুবই ক্লান্ত। কিন্তু তারা থাকবার মতো কোনও জায়গা পেলেন না। হোটেলগুলোও খালি নেই, এরইমধ্যে লোকে ভরে গেছে। হোটেলের মালিক মরিয়মের অবস্থা দেখে দুঃখিত হলো এবং তাদেরকে একটি জায়গা দিল থাকবার জন্য। তবে জায়গাটিতে তার গরু-ভেড়াগুলো থাকে আর তা আবর্জনায় ভরা। কিন্তু শেষে সেখানেই মরিয়ম ও যোসেফ থাকতে বাধ্য হলেন। কারণ তাদের থাকবার আর কোনও জায়গা ছিল না।

সেই রাতেই শিশু যিশুর জন্ম হলো। মরিয়ম গরম কাপড় দিয়ে পুত্রকে জড়িয়ে যাবপাত্রে শুইয়ে রাখলেন। সেই রাতে বেথেলহেমের পাহাড়ের চারপাশে রাখালরা ভেড়ার পাল পাহারা দিচ্ছিল। রাতটি ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার ও নীরব- শুধু একটি ভেড়া একটু চেঁচামেচি করছিল।হঠাৎ সেখানে আলোর ঝলক দেখা গেল- এমন উজ্জ্বল আলো যে, মানুষের চোখ ঢেকে রাখতে হয়। সেই উজ্জ্বল আরো থেকে ঈশ্বরের দূতের স্বর শোনা গেল- ‘ভয় করো না। আমি তোমাদের জন্য পৃথিবীর সব লোকের জন্য একটি আনন্দের খবর এনেছি। বেথেলহেমে আজ ত্রাণকর্তা ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞা করা রাজা জন্মেছেন। তোমরা সেই শিশুটিকে যাবপাত্রে শোয়ানো দেখতে পাবে।’

এরপর রাখালেরা আরও অনেক স্বর্গদূতদের দেখতে পেলো এবং তারা সবাই ঈশ্বরের প্রশংসাগীত করছিল। তারা গাইছিল ‘স্বর্গে ঈশ্বরের মহিমা হোক, আর যারা পৃথিবীতে বাস করছে তাদের শান্তি হোক।’স্বর্গদূতরা চলে যাবার পর আবার আকাশ অন্ধকার হয়ে গেল। রাখালরা নিজেদের মধ্যে এ বিষয়ে নিয়ে বলাবলি করতে লাগলো। তারা বললো- ‘চল, আমরা বেথেলহেমে গিয়ে সেখানে কী ঘটেছে দেখি।’ তারা ভেড়াগুলোকে নিরাপদে রেখে দ্রুত বেথেলহেমের দিকে রওনা হলো।

অবশেষে তারা মরিয়ম ও যোসেফ এবং তাদের শিশুপুত্রকে যাবপাত্রে শোয়ানো অবস্থায় দেখতে পেলো। এসব দেখে তারা বুঝতে পারলো স্বর্গদূত যা বলেছেন তা সত্যি। রাখালরা স্বর্গদূতদের সব কথা মরিয়ম ও যোসেফকে বললো। তারা যিশুকে একটি ভেড়া উপহার দিলো।এরপর তারা তাদের ভেড়ার পালের কাছে ফিরে যাবার সময় তাদের সঙ্গে যাদের দেখা হতে লাগলো তাদের সবাইকে স্বর্গদূতের দেয়া খবর বলতে লাগলো। যেতে যেতে তারা যা দেখেছে ও শুনেছে তার জন্য তারা ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে লাগলো, প্রশংসাগীত গাইতে লাগলো। এটা ছিল অবিস্বরণীয় এক রাত।

অতএব, পৃথিবীতে যিশুর জন্মের প্রধান কারণ ছিল, যা তিনি নিজেই বলেছিলেন, যেন তিনি ‘সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দেন’। ‘যোহন ১৮:৩৭) তিনি কথা ও কাজের মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন যে, ঈশ্বরের শাসনই হলো সম্পূর্ণরূপে ন্যায্য আর এর প্রতি বশ্যতা স্বীকার স্থায়ী সুখ নিয়ে আসে। এছাড়া যিশু এ-ও ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, তিনি এই পৃথিবীতে তাঁর মনুষ্য জীবন “অনেকের পরিবর্তে… মুক্তির মূল্যরূপে” দিতে এসেছেন, যাতে পাপী মানুষের জন্য সিদ্ধতা ও অনন্ত জীবন লাভ করার পথ খুলে যায়। (মাক ১০:৪৫)

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *